সাজ্জাদ জহীর : জীবনপঞ্জী ও দুটি বই
উপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলে আবদ্ধ উপমহাদেশে সকল ভাষাভাষী জনগণের সম্মিলিত জাতীয় মুক্তির অভ্যুদয়ে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা ও শ্রমজীবী শ্রেণীর আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্বের প্রসার সাধনে, কমিউনিস্ট সংগঠন গড়ে তোলার কাজে এবং প্রগতিবাদী লেখক-লেখিকাদের সমবায়ী প্রয়াসে সাজ্জাদ জহীরের বহুমুখী অবদান রয়েছে। তিনি অবশ্য প্রধানতঃ ১৯৩৫ থেকে সত্তরের দশকের শুরু পর্যন্ত প্রগতি সাহিত্যের কর্ণধার হিসাবে পরিচিত। তিনি একাধারে একদিকে যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও প্রেমচাঁদের মতো দিকপাল প্রবীণদের গণমুখী সাহিত্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্রতী নবীন লেখক-লেখিকাদের দলবাঁধা প্রয়াসের মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন, তেমনি এই ঐক্যের ধারাকে প্রত্যক্ষভাবে সাম্রাজ্যবাদ ও তার দেশীয় তাঁবেদার কায়েমী স্বার্থবাদীদের বিরুদ্ধে বিরাট বিরাট গণ-অভ্যুদয়ে শরিক করে বিপর্যয়ের অগ্নিপরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ করেছিলেন।
১৯৭৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ৬৮ বছর বয়সে মৃত্যু তাঁর এই কর্মধারায় ছেদ ঘটিয়েছে।
সাজ্জাদ জহীরের সমবায়ী কাজের ধারাটি অবশ্য অব্যাহত রয়েছে কোথাও উজ্জ্বল উপস্থিতি এবং কোথাও ফল্গুধারা হয়ে। উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যের ধারায় অবিশ্রান্ত বিভিন্নমুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অভিনব সৃষ্টির বিচিত্র প্রয়াসের স্বাভাবিক প্রবণতা এবং পার্থক্যবোধের মধ্যেও যে শ্রমজীবী ঐক্যের ধারাটি কাজ করে আসছে, তার মধ্যে সাজ্জাদ জহীরের উপস্থিতি সক্রিয়। এই সঙ্গেই রয়েছে তার মাতৃভাষা উর্দুতে সংখ্যায় কম হলেও দারুণ শক্তিশালী কলমে লেখা বইগুলি। রয়েছে মেহনতী জনগণের সংগ্রামী জীবনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া তাঁর কর্ম ও চিন্তার অবিচ্ছেদ্য সংযোগের সূত্রগুলি।
আমরা সাজ্জাদ জহীরের এই ত্রিবিধ অব্যাহত উপস্থিতিকে চোখের সামনে রেখে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনধারা এবং কিছুটা বিশদ ও বিশেষভাবে প্রগতি সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর সৃষ্টি ও চিন্তাভাবনার একটি পর্যালোচনা এখানে পেশ করছি।
আমরা সাজ্জাদ জহীরের সমগ্র রচনাবলী থেকে দুটি মাত্র বই বেছে নিয়েছি তাঁর লেখার কাজের পরিচয় দেবার জন্য। এই বই দুটির একটি ‘লণ্ডন কি এক রাত' (লণ্ডনে এক রাত্রি)। এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই এবং একমাত্র উপন্যাস। দ্বিতীয় বইটি ‘মজামিনে সাজ্জাদ জহীর' (সাজ্জাদ জহীরের প্রবন্ধাবলী)। এতে রয়েছে ১৯৭২ পর্যন্ত তাঁর শেষ দশ বছরের লেখাগুলি। তাঁর মৃত্যুর পরে ১৯৭৯ সালে ভারতের ‘উত্তর প্রদেশ উর্দু আকাডেমি' বেগম রাজিয়া সাজ্জাদ জহীরের সহযোগিতায় এই সংকলন প্রকাশ করেছেন।
প্রথমে আমরা খুব সংক্ষেপে সাজ্জাদ জহীরের জীবনকথাটি পেশ করে নিচ্ছি।
১৯০৫ সালে ভারতের যুক্তপ্রদেশের একটি বুদ্ধিজীবী মধ্যবিত্ত অভিজাত পরিবারে লক্ষ্ণৌতে সাজ্জাদ জহীরের জন্ম হয়। ১৯২৬ সালে তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য ইংলণ্ডে যান। সেখানে ইংলণ্ড ও পশ্চিম ইউরোপের যুদ্ধ বিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বামপন্থী প্রগতিবাদী ও শ্রমজীবী আন্দোলনে জড়িত হন। একদিকে যেমন তিনি ইংলণ্ডের শ্রমিক শ্রেণী এবং বিশেষ করে কমিউনিস্টদের সংস্পর্শে এসে মার্কসবাদী দর্শনে প্রভাবিত হয়ে আমাদের উপমহাদেশের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে মজুর কৃষকের অংশগ্রহণকে অভিনন্দিত করে একে প্রসারিত করার উদ্দেশ্যে দেশে ফিরে আসার জন্য উৎসুক হয়ে ওঠেন, তেমনি মাতৃভূমি ও বিশ্বের সংগ্রামী জনগণের কথা দল বেঁধে লেখার জন্য প্রবাসী স্বদেশবাসী ও স্বদেশবাসিনীদের নিয়ে আলাপ আলোচনা শুরু করেন এবং লণ্ডনে একটি প্রগতি লেখক সংঘ গড়ার ব্যাপারেও উদ্যোগ নেন। ১৯৩৫ সালে দেশে ফিরে এসে একদিকে যেমন জওহরলাল নেহেরু প্রমুখ কংগ্রেসের তদানীন্তন বামপন্থীদের সাথে নিজেকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেন, তেমনি পাশাপাশি প্রগতি সাহিত্য আন্দোলনের এবং তার সংঘ গঠনের কাজে প্রবৃত্ত হন। '৩৬ ও '৩৮ সালে পর পর দুটি তদানীন্তন মধ্যভারতীয় সম্মেলনের আয়োজন অনুষ্ঠান ছিল তাঁর একটা বড় কাজ। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তদানীন্তন নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির একজন উদ্যোগী সদস্য হিসেবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে প্রসার করার কর্মীরূপে পার্টির বিভিন্ন গণফ্রন্টের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কার্যক্রমে শরিক হন। তিনি বিভিন্ন শ্রেণী ও গণসংগঠন গড়ে তোলার কাজেও আত্মনিয়োগ করেন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯৩৭ সনে সাজ্জাদ জহীর ঢাকায় ছাত্র ফেডারেশনের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments